দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পরপরই চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) শুরু হতে যাওয়া চার দিনের এই সফরকে কেবল ঢাকা-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা; বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক শক্তি-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে বলেই মনে করছেন তারা।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে এই সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ নানা বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়া থেকে চীন: কূটনৈতিক বার্তা কী?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুদিনের সফরে রোববার (২১ জুন) মালয়েশিয়া সফরে গেছেন। এখান থেকে তিনি সোমবার (২২ জুন) বিকেলে সরাসরি চীন যাবেন।
এমন সফরের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ভারত সফর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা জল্পনা-কল্পনার প্রেক্ষাপটে এই সফরের সময় ও ক্রমকে অনেকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ মনে করেন, এই সফরসূচির পেছনে একটি কৌশলগত বার্তা থাকতে পারে। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের পর চীন সফর একটা কৌশল হতেই পারে। তিনি হয়তো সমালোচকদের অযথা কথা বলার সুযোগ দিতে চাননি। এটা ইতিবাচক।
সাবেক রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, গণমাধ্যমে এমন আলোচনা ছিল যে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভুটান সফর করবেন, তারপর ভারত যাবেন। কিন্তু ভারত থেকে সে বিষয়ে যথাযথ সাড়া পাওয়া যায়নি। কারণ ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভুটান না হয়ে সরাসরি ভারত সফর করুন। এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফরের পরিকল্পনা করেছেন, তখন ভারত হয়তো ভাবছে—ভুটান হয়ে ভারত আসাই ভালো ছিল।
যদিও প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফর কিংবা এরপর ভারত সফরের পরিকল্পনার যে খবর ছড়িয়েছিল সেটিকে গুজব বলে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান।
বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান
বাংলাদেশ আজ আর শুধু একটি দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র নয়; বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে অবকাঠামোগত সংযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে এ অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করছে।
নির্ভরশীলতা বনাম স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি
মালয়েশিয়া থেকে চীন সফর বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান এবং বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রূশদ। এ প্রসঙ্গে আবু রুশদ বলেন, ভারত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আমরা ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় দেখেছি ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী প্রায়ই বলতেন, বিএনপি চীনকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে। এই ছাতা থেকে তারা বাংলাদেশকে মুক্ত করবে।
আবু রূশদের মতে, এখন বাংলাদেশ তার স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে ভারতের ইঙ্গিতে কিছু হচ্ছে না। মালয়েশিয়ায় আমাদের জনশক্তির একটি বিরাট ইস্যু রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ১৯৭৭ সালে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। সুতরাং এটিকে ভিন্নভাবে দেখার কিছু নেই।
তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কৌশলগত ছত্রছায়া দরকার, সামরিক বিষয়াদি রয়েছে, অর্থনৈতিক বিশাল কর্মযজ্ঞ রয়েছে।
অন্যদিকে অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান মনে করেন, এখন আর বাংলাদেশ সরকার সেই অবস্থায় নেই যে কারও ডিকটেশনে সফর ঠিক করবে। আমাদের বর্তমান সরকার এবং বিশেষ করে প্রাইম মিনিস্টার ও ফরেন মিনিস্টার খুবই কনফিডেন্ট। কোনো কিছুই হয়তো তাদের অভিষ্ট লক্ষ্য থেকে দূরে সরাতে পারবে না।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নজর
বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ বর্তমানে শুধু দিল্লি নয়, ওয়াশিংটনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ বলেন, ভারতের সঙ্গে যেমন আমাদের সমতার ভিত্তিতে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন, তেমনি চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের বিষয়ে ভারতের আপত্তির প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান বলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। তারা চাইবে না বাংলাদেশ পাকিস্তান কিংবা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করুক, বিশেষ করে কোনো সামরিক ইস্যুতে। এছাড়া তিস্তা ইস্যুও রয়েছে। সুতরাং ভারত এখনো চাইবে, চীন সফরে যেসব সম্ভাব্য অ্যাগ্রিমেন্টের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো যেন স্বাক্ষরিত না হয়।
তবে আবু রূশদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে প্রকাশ্যে কখনো আপত্তি তোলেনি।
তার ভাষায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বাংলাদেশে চীনের এ ধরনের কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি বা অভিযোগ করেনি। কারণ বাংলাদেশ এখানে চীনের কোনো সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে না। আমরা এমন কোনো খবর পাইনি।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে, যেখানে পাকিস্তান চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান বলেন, আমেরিকার এ বিষয়ে কোনো আপত্তিও নেই, সম্মতিও নেই; বরং যথেষ্ট আগ্রহ আছে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর যেন সফল হয়।
ভারসাম্যের কূটনীতি ও সফরের সফলতা
আবু রূশদ এবং মুন্সি ফয়েজ দুজনই বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো এমন যে সবার সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রাখা জরুরি। কোনো দেশের সঙ্গে বড় চুক্তি করার ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলেও সেটি কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত নয়; বরং উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক এগোচ্ছে।
অন্যদিকে অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান বলেন, এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে বাস্তবতা যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাতে মনে হয় বাংলাদেশ হয়তো তিস্তার বিষয়ে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনৈতিক দক্ষতা ও প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখার কথাও বলেন।
অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য সম্প্রতি ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পাওয়াকে বিশ্লেষকরা ঢাকা-বেইজিং অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন, বন্দর উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বহু আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া থেকে চীন সফর নিছক একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তারা বলছেন, সফরটি কি স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতির প্রকাশ, নাকি কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন বার্তা-তার চূড়ান্ত উত্তর মিলবে সফর-পরবর্তী চুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্য দিয়েই।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এখন আর কারও প্রভাব বলয়ের অংশ নয়; বরং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক কূটনীতির পথেই এগোতে চায়।
সেই সুরই শোনা গেল প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের কণ্ঠে। তিনি শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ এখন থেকে বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত নিজস্বভাবে নেবে এবং কোন দেশ কখন সফর করা হবে, তা সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সরকার এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে বাস্তব প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে, কোনো বাহ্যিক চাপ বা প্রত্যাশার কারণে নয়।