logo

সময়: ০১:০৪, সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ০১:০৪ অপরাহ্ন

সর্বশেষ খবর

গ্যাসের জন্য হাহাকার

Ekattor Shadhinota
২৭ জুলাই, ২০২৬ | সময়ঃ ১০:৩৯
photo
গ্যাসের জন্য হাহাকার

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এক সপ্তাহ ধরে দেশে গ্যাস-সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ক্রমে উৎপাদন কমতে থাকা গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকে নেমেছে। ফলে শিল্প উৎপাদন কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি বাড়ছে। বাসাবাড়িতে গ্যাস না পেয়ে নানা ধরনের ভোগান্তিতে এবং অতিরিক্ত খরচের বোঝা নেমে এসেছে নাগরিক জীবনে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।


দেশে গত প্রায় এক দশক ধরে চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ কমে আসছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করেও ঘাটতি কমানো যায়নি। ফলে এক যুগে গ্যাসের চাহিদা, অনুসন্ধান, উৎপাদন ও সরবরাহে সমন্বয় করতে না হওয়ায় গত চার-পাঁচ বছর ধরে গ্যাসভিত্তিক শিল্প ‘ন্যূনতম বা সীমিত সক্ষমতা’ ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদনে বা এলএনজি আমদানিতে বা গ্যাসে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় হঠাৎ সমস্যা দেখা দিলে সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। গত সপ্তাহে পেট্রোবাংলার এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার বা ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর ফের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। টার্মিনালটির এ ত্রুটি সারিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে আরও ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা। অর্থাৎ এ কয়দিন ভোগান্তিও অব্যাহত থাকবে।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত পেট্রোবাংলার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত সপ্তাহে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর থেকেই টার্মিনালটি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট হলেও দুর্ঘটনার আগেও সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে; অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সব খাতেই।

কবে কমবে দুর্ভোগ

পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একাধিক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ করছেন। তবে এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কবে পুরোপুরি টার্মিনাল চালু হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে আংশিকভাবে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে টার্মিনালটির পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মেরামতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমা ও কারিগরি যাচাইয়ের কিছু প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে।

রান্নার চুলা বন্ধ কিংবা হিমশিম অবস্থা

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর মগবাজার, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কলাবাগান, ধানমন্ডি, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় পাইপলাইনের গ্যাস আসছে না। কোথাও গভীর রাতে সামান্য চাপ ফিরে এলেও সকালে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও সারা দিন নিম্নচাপে মিলছে গ্যাস। আর কোথাও একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা রাইস কুকারে রান্না করছে। এলপিজি ব্যবহার করছে কেউ কেউ। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার আবার মাটির বা ইটের অস্থায়ী চুলা তৈরি করে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়ছে ভোগান্তি, অন্যদিকে বেড়েছে ব্যয়। বাইরে থেকে খাবার কিনতে হওয়ায় সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

শিল্পে উৎপাদন নেমেছে প্রায় ৩০ শতাংশে

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গ্যাসনির্ভর তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটওয়্যার ও অন্যান্য কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, অনেক কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দৈনিক ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেত তিতাস। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্প ও আবাসিক খাতে সংকট আরও বেড়েছে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি চরমে উঠেছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, স্বাভাবিকভাবে একটি স্টেশন পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। অথচ অনেক এলাকায় বর্তমানে চাপ নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার তারও নিচে।

বাড়তে পারে লোডশেডিং

গ্যাস-সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। এতে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমেছে।

পিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক দিনে বৃষ্টি ও সরকারি ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় বড় ধরনের লোডশেডিং এড়ানো গেছে। তবে তাপমাত্রা বাড়লে এবং শিল্পকারখানা পুরোদমে চালু হলে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

শেয়ার করুন...

আরও পড়ুন...

ফেসবুকে আমরা…