logo

সময়: ০৬:০৪, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬

২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

সর্বশেষ খবর

রাজধানীর বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (দক্ষিণ) কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট

Ekattor Shadhinota
১০ মার্চ, ২০২৬ | সময়ঃ ০১:৪৭
photo
রাজধানীর বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (দক্ষিণ) কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট

রাজধানীর বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (দক্ষিণ) কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে নাম এসেছে যুগ্ম কমিশনার মোঃ কামরুল ইসলামের। তাঁর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া, লাইসেন্স নবায়নে উৎকোচ গ্রহণ, নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে কর ফাঁকির সুবিধা দিয়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম এবং ডিসি পূরবী সাহার নিয়ন্ত্রণাধীন রাফায়েত ফেব্রিক্স এবং এস ইসলাম হোম এন্ড ফ্যাশন লিমিটেড মাত্র ১ বছরেই ৪৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। কামরুল ইসলাম দক্ষিণ বন্ডে পদায়নের পর মাত্র ১ বছরে এই প্রতিষ্ঠানদ্বয়কে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সহায়তা করছেন। ভুয়া নিরীক্ষা এবং তথ্য যাচাই না করে সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানসমূহের বন্ডেড প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করেছেন। তাই সামনের বছরে দুই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ হবে ৮০০ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত মাসে এই রাফায়েত ফেব্রিক্স প্রতিষ্ঠানে প্রিভেন্টিভের নাম করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরদারী তুলে দিতে জোর করে পত্র জারী করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম কাস্টমস এই প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানিতে নজরদারী করতে পারবে না। কথিত আছে, কামরুল ইসলাম এই কাজে এই প্রতিষ্ঠান হতে ৩০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করে। আর এই ঘুষের লেনদেন সম্পন্ন হয় সুদূরে জাপানে। কামরুল ইসলাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্যের আশীর্বাদে গত ৬ মাসে তিন বার জাপান সফর করেন। জাপানে তার গাড়ীর ব্যবসা ছাড়াও আবাসনে বিনিয়োগ রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিআইসি সেলকে ম্যানেজ করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে ঘুষ নেন ১ কোটি টাকা। এই ঘুষ সরাসরি ফালতুর মাধ্যমে উত্তরায় গ্রহণ করেন। পরবর্তী আরও ৩০ লাখ টাকা গ্রহণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন প্রভাবশালী সদস্যকে দেয়া হয়। শুল্ক গোয়েন্দায় ডিজি থাকাকালীন এই সদস্য রাজীব এন্টারপ্রাইজ সিএন্ডএফ এজেন্টের সাথে মিলিতভাবে প্রতি ৫ লাখ টাকা রফা দফা করে বন্ডের মাল পাচারে সিন্ডিকেট তৈরী করে।
নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানাধীন মফস্বল গ্রাম নোয়ানগরের মৃত মোহাম্মদ আলীর সন্তান এই কামরুল ইসলাম। ফ্যাসিস্ট আমলে আলোচিত জনপ্রশাসনের ১২টি গেজেটের মাধ্যমে ৩০তম বিসিএসে কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেট হয় ১৭-০৫-২০১২ সালে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐ বিসিএসে প্রশ্ন ফাঁসের কারিগর ড্রাইভার আবেদ আলীর থেকে প্রশ্ন কিনে লিখিত পাস করেন কামরুল। এরপর পতিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার তৎকালীন জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সুপারিশে ভাইভা বৈতরণী পার হন তিনি। যার কন্ট্রাক্ট ছিলো ৩৫ লাখ টাকা। গেজেট অনুযায়ী ০৩-০৬-২০১২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারী) হিসেবে যোগদান করেন। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আনার নিয়ম থাকলেও কামরুল ইসলামের যোগসাজশে তা সরাসরি চলে যাচ্ছে রাজধানীর ইসলামপুর ও নয়াবাজারের পাইকারি মার্কেটে। এর ফলে সরকার প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বেশ কিছু অখ্যাত ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ফাইল ক্লিয়ারেন্সের বিনিময়ে তিনি বড় অংকের কমিশন নেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েক জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। উৎকোচ ছাড়া নড়ে না ফাইল

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে বলেন, “বন্ড লাইসেন্স নবায়ন কিংবা অডিট রিপোর্ট জমা দিতে গেলেই যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলামের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা থাকা উপ-কমিশনার পূরবী সাহার মাধ্যমে বড় অংকের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তুচ্ছ অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয় কয়েক মাস।” সরেজমিন তদন্তে জানা গেছে, গত দুই বছরে কামরুল ইসলামের নির্দেশে বেশ কিছু বৈধ প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে শুধুমাত্র ‘অনৈতিক সুবিধা’ না পাওয়ার কারণে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কামরুল ইসলামের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ। ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ছাড়াও তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার বড় চাপা গ্রামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি। বানিয়েছেন বিশাল আকৃতির বাগান বাড়ি। গ্রামের মতো জায়গায় কামরুল ইসলাম দুর্নীতির টাকায় বানিয়েছেন আধুনিক সুইমিং পুল। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে হুণ্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর পরই কামরুল ইসলাম চলে যান সিঙ্গাপুরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন শতকোটির উপরে টাকা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কামরুল ইসলামের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। অর্থ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য ‘বন্ড সেক্টরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দেশের রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন...

আরও পড়ুন...

ফেসবুকে আমরা…