গবেষণা প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।
হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বের গবেষণা উপ-প্রকল্প নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রস্তাব তৈরি, জমাদান ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় গবেষণা অর্থায়নের জন্য জমা দেওয়া প্রস্তাবগুলোতে আবেদনকারী গবেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গোপন রেখে বিশেষ কোডের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মূল্যায়নের সময় যাতে গবেষক বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ না পায়, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য রিভিউয়ারদের একটি প্যানেল থেকে লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত রিভিউয়ার নির্বাচন করা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কিংবা কোনো ধরনের তদবিরের সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছে ইউজিসি।
শুক্রবার (০৭ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমিতে হিট প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ‘উপ-প্রকল্প মূল্যায়ন পরিচিতি’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এসব তথ্য জানান।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, হিট প্রকল্পের প্রথম ধাপে উপ-প্রকল্প নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে কিছু নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। যদিও ওই ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, তবু গবেষক ও শিক্ষক সমাজে উপ-প্রকল্প নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হোক—ইউজিসি তা চায় না। এ কারণেই দ্বিতীয় ধাপের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, “আমরা প্রকৃত গবেষকদের খুঁজে বের করতে চাই। প্রকল্প নির্বাচনে ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, গবেষণার গুণগত মান, নতুনত্ব এবং সম্ভাব্য প্রভাবই হবে মূল বিবেচ্য।”
তিনি জানান, গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য তিনটি উৎস থেকে সম্ভাব্য রিভিউয়ারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আবেদনকারীদের প্রস্তাবিত বিশেষজ্ঞ, গুগল ফর্মের মাধ্যমে আগ্রহ প্রকাশকারী গবেষক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রাথমিক রিভিউয়ার প্যানেল গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি সংশ্লিষ্ট গবেষকদের প্রকাশনা, গবেষণা অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা যাচাই করে চূড়ান্ত প্যানেল নির্ধারণ করেছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রতিটি গবেষণা প্রস্তাবকে একটি স্বতন্ত্র কোড দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য ছয় থেকে আটজন সম্ভাব্য রিভিউয়ার রাখা হলেও লটারির মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে দুজনকে চূড়ান্ত রিভিউয়ার হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। মূল্যায়নের নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো রিভিউয়ার জানতে পারবেন না কোন গবেষণা প্রস্তাব তার কাছে যাচ্ছে।
“এর মাধ্যমে আমরা মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব বাহ্যিক প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখতে চাই,” বলেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, গবেষণা সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে শুধু গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ালেই হবে না; অর্থায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণ ও প্রস্তাব মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। গবেষকদের আস্থা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ তৈরিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও জানান, গত বছর অর্থায়ন পাওয়া ১৮০টি গবেষণা প্রকল্প নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থের অনুপযুক্ত ব্যবহার কিংবা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেলে অর্থায়ন বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যানের মতে, হিট ও আইসিএসটিইপি প্রকল্পের গবেষণা তহবিল যথাযথ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশের গবেষণা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করে একটি শক্তিশালী ও আস্থাভিত্তিক গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
কর্মশালায় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন, অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী এবং হিট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. আসাদুজ্জামানসহ ইউজিসি ও হিট প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।