logo

সময়: ০৩:০০, বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ০৩:০০ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ খবর

মাদকের আগ্রাসনে ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, এবার বাবার জীবনও গেল

Ekattor Shadhinota
২৮ জুলাই, ২০২৬ | সময়ঃ ১০:১৮
photo
মাদকের আগ্রাসনে ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, এবার বাবার জীবনও গেল

সাভারের রাজফুলবাড়িয়া ছাকিপাড়া এলাকায় ৩৮ বছর বয়সী মহিন মিয়া নিজ কিশোর ছেলের হাতে নিহত হয়েছেন। পারিবারিক কলহের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেলেও, স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কলহের পেছনে ছিল নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ। একজন বাবার জীবন শেষ হয়ে গেল, একটি পরিবার হারাল তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে, আর একজন কিশোর এখন হত্যার অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বড় যে ভয়ংকর বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা হলো—মাদক কীভাবে একটি পরিবারকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মাদক প্রথমে মানুষকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে কেড়ে নেয় বিবেক, নিয়ন্ত্রণবোধ ও স্বাভাবিক আচরণ। একজন মানুষ কখন নেশায় জড়িয়ে পড়বে, কখন তার আচরণ বদলে যাবে, কখন স্বাভাবিক কথাবার্তা ঝগড়ায় রূপ নেবে—অনেক সময় পরিবারও তা বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু যখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যায়, একটি পরিবার ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতন, অশান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।

মহিন মিয়া দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন পরিশ্রম করে সংসার চালানোর চেষ্টা করতেন। অন্যদিকে, তার কিশোর ছেলের সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই বিরোধ হতো বলে জানা গেছে। একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে বড় সংকট আর কী হতে পারে—যে সন্তানকে মানুষ করার জন্য বাবা সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, সেই সন্তানই যদি নেশার কবলে পড়ে বাবার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে!

এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়। মাদক একটি পারিবারিক সমস্যা, একটি সামাজিক সমস্যা এবং শেষ পর্যন্ত একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তার পরিবারকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। তার আচরণে পরিবর্তন আসে, অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নেয় এবং প্রতিদিনের জীবন পরিণত হয় আতঙ্ক ও অশান্তিতে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মাদকের বিস্তার এখন কিশোরদের মধ্যেও উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। যে বয়সে একজন কিশোরের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই বয়সে অনেকে নেশার জগতে প্রবেশ করছে। প্রথমে হয়তো কৌতূহল, বন্ধুর প্ররোচনা কিংবা খারাপ সঙ্গ থেকে শুরু হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নেশাই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে পুরো জীবনকে।

পরিবারগুলোও অনেক সময় সমস্যাটি গোপন রাখে। ‘মানুষ কী বলবে’—এই চিন্তায় অনেক বাবা-মা সন্তানের নেশার বিষয়টি প্রকাশ করতে চান না। কেউ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সন্তান নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কেউ আবার কঠোর শাসনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চান। কিন্তু বাস্তবে নেশা এমন একটি সমস্যা, যা অবহেলা করলে আরও গভীর হয়। কখনো কখনো সেই গভীরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে একটি পরিবার তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষকেই হারিয়ে ফেলে।

মহিন মিয়ার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারিত হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু শুধু একজনকে গ্রেপ্তার করে কিংবা একটি মামলার বিচার শেষ করলেই মাদক সমস্যার সমাধান হবে না। এই ঘটনার মূল শিক্ষা আমাদের আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

প্রশ্ন হলো—মাদক কোথা থেকে আসছে? কারা কিশোরদের হাতে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে? একটি এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়ার পরও কেন তা বন্ধ করা যাচ্ছে না? মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু মাদক বিক্রি করে না; তারা ধ্বংস বিক্রি করে। তারা একটি কিশোরের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, একটি পরিবারের শান্তি কেড়ে নেয় এবং কখনো কখনো একটি পরিবারকে এমন ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়, যার ক্ষত কোনোদিন শুকায় না। তাই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।

তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়। পরিবারকে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনকেও একযোগে কাজ করতে হবে।

মাদকাসক্ত কিশোরকে শুধু ‘খারাপ ছেলে’ বলে দূরে সরিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। তবে একই সঙ্গে যারা মাদক সরবরাহ করে এবং তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

মহিন মিয়ার মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি মাদকের ভয়াবহতার একটি নির্মম উদাহরণ। একটি পরিবারের ভেতরের দীর্ঘদিনের অশান্তি শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত পরিণতি পেয়েছে। আজ একজন বাবা নেই, একটি পরিবার ভেঙে গেছে, আর একজন কিশোরের জীবনও ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে এখন আর শুধু স্লোগান নয়, কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। কারণ মাদক যখন একটি পরিবারের দরজায় ঢোকে, তখন সে একা আসে না—সঙ্গে নিয়ে আসে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধ এবং কখনো কখনো মৃত্যুও।

মহিন মিয়ার মতো আর কোনো বাবার জীবন যেন মাদকের ছোবলে শেষ না হয়—এটাই হোক এই নির্মম ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

আল আমিন,প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ

শেয়ার করুন...

আরও পড়ুন...

ফেসবুকে আমরা…