আবদুল বাসেদ নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি:বহুমাত্রিক গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সমন্বয় ঘটিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল। আজ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি ২০২৬) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক বহুমাত্রিক গবেষণা সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীরা অংশ নেন।
নোবিপ্রবি উপাচার্য বলেন, আমাদের প্রযুক্তির ভোক্তা থেকে প্রযুক্তির স্রষ্টা হতে হবে। কুমিল্লায় বসেই কেন আমরা স্বল্পমূল্যের রোগ নির্ণয় কিট তৈরি করতে পারব না? নোয়াখালীতে জিন এডিটিং ব্যবহার করে লবণসহিষ্ণু ফসল কেন উদ্ভাবন করতে পারব না? বহুমাত্রিক গবেষণা কেবল একাডেমিক উৎকর্ষ নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাকে শুধু ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠ, শিল্পকারখানা ও মানুষের জীবনে প্রয়োগযোগ্য করে তুলতে হবে। গবেষণা যদি শুধু বইয়ের তাকেই থাকে, তবে তা নিষ্ক্রিয়। কিন্তু যদি তা মাঠে, কারখানায় বা হাসপাতালে পৌঁছায় তবেই তা জীবন্ত।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল তাঁর বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থা বিষয়ভিত্তিক বিভাজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত এক শতাব্দী ধরে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত “বিশেষায়ন”-এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বিভিন্ন বিভাগে আমরা উঁচু দেয়াল তৈরি করেছি। একজন পদার্থবিজ্ঞানী সাধারণত জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলতেন না; একজন রসায়নবিদ খুব কমই গণিতবিদের সঙ্গে বসতেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি- একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলো আর কোনো বিভাগের সীমানা মানে না। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং ডাটা সায়েন্সেরও বিষয়। আর তাই বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মতো জটিল সমস্যাগুলো আর একক কোনো বিষয়ের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন শাখার জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য।
উপাচার্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতার প্রসঙ্গেও গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। গবেষণায় স্বচ্ছতা, তথ্যের নির্ভুলতা ও একাডেমিক সততা নিশ্চিত করতে হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন,ব্লু ইকোনমি, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি, টেকসই মৎস্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক গবেষণার বিশাল সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ব্রেইন ড্রেইন নয়, বরং ব্রেইন সার্কুলেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দেশীয় গবেষকদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. হায়দার আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন, প্রফেসর ড. মো. শহীদুল ইসলাম, উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর ড. মো. পেয়ার আহমেদ, উপাচার্য, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), প্রফেসর ড. হোসাইন উদ্দিন শেখর, উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর ড. মাসুদা কামাল, সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল করিম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সোলায়মান, ট্রেজারার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্মেলনের একটি সেশন পরিচালনা করেন ড. প্রদীপ দেবনাথ, সহযোগী অধ্যাপক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে বহুমাত্রিক গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন সেশন, গবেষণা উপস্থাপন ও প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।