logo

সময়: ০৩:০৯, বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ খবর

আত্তীকৃত কলেজঃ শিক্ষার সংকট ও সমাধান

Ekattor Shadhinota
১৪ জুলাই, ২০২৬ | সময়ঃ ১০:৫০
photo
আত্তীকৃত কলেজঃ শিক্ষার সংকট ও সমাধান

শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি। যে রাষ্ট্র যত বেশি শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, সে রাষ্ট্র তত দ্রুত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। তাই শিক্ষার অধিকার কেবল একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকারও। বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালে কলেজশিক্ষা উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদানকালে উল্লেখ করেছিল যে, প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে কর্মদক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হলে কলেজশিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শ্রমবাজার-উপযোগী দক্ষতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।


বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের ওপর সর্বস্তরে শিক্ষার সম্প্রসারণ, সুষম ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG-4)-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চশিক্ষার মান কেবল ভবন নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠান সরকারি করার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, গবেষণা, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, তথ্যপ্রযুক্তি, কার্যকর একাডেমিক নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। শিক্ষকসংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা, গবেষণার পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মান—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণেই উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নির্ধারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণা কার্যক্রম এবং একাডেমিক সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। দেশের বহু উপজেলায় সরকারি কলেজ না থাকায় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে হতো। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, যাতায়াতের অসুবিধা এবং আবাসন সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়ত। অন্যদিকে, সরকারি ও বেসরকারি কলেজের মধ্যে শিক্ষক, অবকাঠামো, শিক্ষার মান এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও ছিল বিস্তর পার্থক্য।


এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১৬ সালে দেশের প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি কলেজ জাতীয়করণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০১৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে এসব কলেজ সরকারি ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার সুযোগকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমানো, শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবসম্পদনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জাতীয়করণের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের কয়েক বছর পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ আত্তীকৃত কলেজগুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, পদসৃজনের বিলম্ব, স্থায়ীকরণ প্রয়োজনীয় জনবল ও শিক্ষাসামগ্রীর অভাব, আর্থিক বৈষম্য এবং একাডেমিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত। 
বিশেষ করে ২০১৬ সালে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রায় এক দশক ধরে অধিকাংশ আত্তীকৃত কলেজে নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বহু বিষয়ে স্থায়ী শিক্ষক নেই; কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক বিভাগের বা একাধিক বর্ষের পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে। অনেক কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষক বা সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হলেও তা কখনোই মানসম্মত উচ্চশিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। এই দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষকসংকট শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় অগ্রগতির ওপরও পড়ছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, হিসাবরক্ষক, গ্রন্থাগারিক, ল্যাব সহকারীসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মচারীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় কলেজগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয়করণের আগে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি আত্তীকরণ, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, পদায়ন, পদোন্নতি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত গবেষণা, সেমিনার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা এবং মানোন্নয়ন কার্যক্রম অধিকাংশ কলেজেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও গবেষণার পরিবেশের অভাব উচ্চশিক্ষার গুণগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।


এই সংকটগুলোর প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশাও অনেকাংশে অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আত্তীকৃত কলেজগুলোর সংকট কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এই সংকট নিরসনে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা।


প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে সব শূন্যপদে যোগ্য শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট দূর করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত পদসৃজন সম্পন্ন করতে হবে। বিসিএস নন-ক্যাডার মেধাতালিকা থেকে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের দ্রুত সমাধান করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাঁদের জন্য নিয়মিত পদোন্নতির সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, জাতীয়করণের আগে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত সব জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। জ্যেষ্ঠতা, পদায়ন, পদোন্নতি, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।


তৃতীয়ত, প্রতিটি আত্তীকৃত কলেজে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা অনুদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা ও মানোন্নয়ন কার্যক্রমে নিয়মিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কলেজ প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি আত্তীকৃত কলেজের জন্য সময়সীমাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বাধীন মান-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।


সরকারকে আত্তীকৃত কলেজগুলোকে কেবল প্রশাসনিকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত অর্থে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শুধু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎই গড়ে তোলে না; এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ  ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই বাস্তবতায় আত্তীকৃত কলেজগুলোর প্রায় এক দশক ধরে নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ স্থবির থাকা কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ কর্মশক্তি সৃষ্টি এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেও একটি বড় নীতিগত প্রতিবন্ধকতা। তাই দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, পদসৃজন, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আত্তীকৃত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক জটিলতার স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।


জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকার শুধু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন করতে চায়নি; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ভিত্তি রচনা করতে চেয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, সরকারি ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এসব কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা, দক্ষ প্রশাসন এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম ব্যয়ে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে আসবে।


ফলে যে উদ্দেশ্যে কলেজগুলো জাতীয়করণ করা হয়েছিল, তার পূর্ণ সুফল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জিত হয়নি। একাডেমিক কার্যক্রমেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। সরকারি কলেজে অধ্যয়ন করলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিয়মিত ক্লাস, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
 

শেয়ার করুন...

আরও পড়ুন...

ফেসবুকে আমরা…