খাতা মূল্যায়নে ‘সহানুভূতির নম্বর’ নীতির অবসান হওয়ায় গতবারের মতো এবারও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে। ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য। ভিত দুর্বল হওয়ায় ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়েই ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। একই কারণে হিসাববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত বিষয়েও অনেক শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। বিভাগ বিচারে বিজ্ঞানে ২৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বাণিজ্যে ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ও মানবিকে ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন।
এসবের প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর থেকে প্রতিবছর পাশের হার বেড়েছে বা সামান্য কমবেশি হয়েছে। কিন্তু এবার তাতে বড় ধস নামল। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। এবার ৪০ হাজার ৮৪ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৬ শিক্ষার্থী। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমল ৩২ হাজার ৯২ বা ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
টানা দুই বছর ধরে এইচএসসি ও সমমানের ফল বিপর্যয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত বছর পাশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমার পর এবার তা আরও কমেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে কোনো পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সহানুভূতির নম্বর’ বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হচ্ছে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরীক্ষার্থীদের খাতায় ২৮ পেলে ৩৩ করে পাশ করানো বা গ্রেড পরিবর্তনের জন্য ২ থেকে ৫ নম্বর পর্যন্ত ‘সহানুভূতির’ নম্বর দেওয়ার যে অলিখিত নিয়ম চালু ছিল, তা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থান ঘিরে সার্বিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের অধীনে খাতা দেখার ধরন বদলে যাওয়ায় গতবার মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিকেও পাশের হারে ধস নামে। এবার এসএসসিতে পাশের হার আরও কমে হয় ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আর এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল এলো। ফলাফলে এমন ধসের পেছনে নির্মোহভাবে খাতা দেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখার কথা বলছে সরকার।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত সরকারের আয়োজিত প্রথম এই এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় আমরা নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছি। প্রত্যেকের খাতায় যে পরীক্ষা যেভাবে দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাইছি এবং এই প্রথম বারের মতো থাকছে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষা।’
এদিকে এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বারবার এমন ফল বিপর্যয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বিষয়টিও উঠে আসছে। এর নেপথ্যে কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকট রয়েছে বলেও মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাবিদরা বলেন, ক্লাসে শেখানো ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। এতে পরীক্ষায় একটু ভিন্ন কাঠামোর প্রশ্ন এলেই তারা গুলিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ যে বিষয় তারা পড়ছে, তাতে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে পরীক্ষায় খারাপ করছে তারা। শিক্ষাব্যবস্থার এ ত্রুটি ও দুর্বলতার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের শিক্ষক সংকট প্রকট। এ কারণে এ দুই বিষয়ে ফেলও বেশি। কলেজ-মাদ্রাসায় সশরীরে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকরাও শিক্ষকসংকটের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে শিক্ষার মানের সঙ্গে ভালো ফলাফলও নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অভিভাবকরা।
এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএম)—সব মিলিয়ে ১১ বোর্ডের পরীক্ষার ফল গতকাল শনিবার প্রকাশিত হয়। ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। বাকি ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯৩ জন পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৫ হাজার ৫৯২ জন, যা ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সেই হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে পাশের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। এবার ছাত্রদের ৫২.২৫ শতাংশ অকৃতকার্য, ছাত্রীদের ৪৩.৬৯ শতাংশ ফেল। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা টানা দুই বছর ধরে কমছে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৮২৭ জন। বর্তমানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৭২ শতাংশ কম। ধারাবাহিক এই ফল পতন শিক্ষা ব্যবস্থার মান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এবার অনেক অগ্রসর শিক্ষার্থী ভালো করতে পারেননি, পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ফল আরও নাজুক। গ্রাম ও শহরে সাফল্যের বৈষম্য অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে প্রকট হয়েছে।
কোন বোর্ডের পাশের হার কত :এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডে পাশের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৬১.৮০ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাশের হার ৪৫.০৬ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৮.০৪ শতাংশ। যশোর শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৪.৯২ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫২.০৭ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে পাশের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ। সিলেট বিভাগে পাশের হার ৫০.৯০ শতাংশ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫১.৪৪ শতাংশ। এছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৬১.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৯.৪৩ শতাংশ।
দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থীর এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা: শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বরাবরের মতই শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইলে এসএমএস করেও উচ্চমাধ্যমিকের ফল জানা যাচ্ছে। এদিকে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে কেবল অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে এক বছর পর (পরের বছরের পরীক্ষায়) আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। সেক্ষেত্রে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়গুলোয় অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে এক জন শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে আবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ফল প্রকাশের পর এক মাস পুনর্নিরীক্ষণের কাজ চলবে। পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে। এরপর পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে ফল প্রকাশ করা হবে।
কোন বোর্ডে কতজন জিপিএ-৫ পেলেন: এবার দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে বরাবরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পেয়েছে বরিশাল বোর্ড। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে দেখা গেছে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২০ জন। এছাড়া যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ২২৮ জন, দিনাজপুরে ২ হাজার ৯৫৩ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯২৯ জন এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ২ হাজার ১৩৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। অন্যদিকে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ৩১৩ জন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ২০৫ জন এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৯৫০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন জিপিএ-৫ পাওয়ার তালিকায় রয়েছে বরিশাল বোর্ড। এদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ২৫০ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলক ভালো ফল: বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলক ভালো ফল করেছেন শিক্ষার্থীরা। শুধু ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এ দুই বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এটা পুরো ফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। বাংলা বিষয়ে কুমিল্লা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৯৫ দশমিক ০১ শতাংশ। যুক্তিবিদ্যায় রাজশাহী বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ পাশের হার পাওয়া গেছে। বিপরীতে ইংরেজি ও হিসাববিজ্ঞানে বোর্ডগুলোর পাশের হার তুলনামূলক কম। ইংরেজিতে বরিশাল বোর্ডে সর্বনিম্ন ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং হিসাববিজ্ঞানে একই বোর্ডে ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। আইসিটি বিষয়ে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং বরিশালে সর্বনিম্ন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটাতে বিশেষ কোর্স কারিকুলাম হাতে নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ফলাফলে পাশের হার কমার পেছনে ইংরেজি ও আইসিটির খারাপ ফল বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাশ করেননি একজনও, শতভাগ পাশ ১৩৯: এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক জন শিক্ষার্থীও পাশ করেননি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ২০২। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাশ করেননি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে শতভাগ পাশ করেছে ১৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গত বছর শতভাগ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৫৪টি। আর তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের শতভাগ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ১ হাজার ৩৮৮টি।
পাশের হারে মেয়েরা এগিয়ে, জিপিএ-৫ এ ঘুরে দাঁড়াল ছেলেরা: উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও পাশের হারে এগিয়ে আছেন ছাত্রীরা। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর মেয়েদের পেছনে ফেলতে পেরেছেন ছেলেরা। এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছিলেন ছাত্রী। তাদের মধ্যে পাশ করেছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। সেই হিসাবে ছাত্রীদের পাশের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে, ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তাদের পাশের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাশের হারে ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন মেয়েরা। পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন। অর্থাৎ মেয়েদের চেয়ে ৬৪২ জন বেশি ছেলে পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ২০২৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের হার ও জিপিএ-৫, দুই দিক দিয়েই এগিয়ে ছিলেন মেয়েরা।
সর্বোচ্চ পাশের হার ঢাকা বোর্ড, সর্বনিম্নে বরিশাল: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাশের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অন্যদিকে সব বোর্ডের নিচে অবস্থান নিয়ে পাশের হারে তলানিতে নেমেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। ফলের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা বোর্ডে পাশের হার সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই বোর্ডে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ জন শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে বরিশাল বোর্ড। এই বোর্ডে ৫৭ হাজার ৯১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছেন মাত্র ২৫ হাজার ৯৭০ জন। জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এই বোর্ড থেকে রেকর্ড ১৬ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা ৯টি সাধারণ বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫২০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন রাজশাহী বোর্ডে। বরিশাল বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন সবচেয়ে কম—মাত্র ৯৫০ জন পরীক্ষার্থী।
৯ সাধারণ বোর্ডের বিজ্ঞান শাখা থেকেই এসেছে সিংহভাগ জিপিএ-৫: এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখায় ৯ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে ঢাকা বোর্ড। অন্যদিকে, মানবিকে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রাজশাহী ও যশোর অঞ্চল। ঢাকা বোর্ডে বিজ্ঞানের ৮১ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ শাখায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাশের হার ময়মনসিংহে ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিজ্ঞানে পাশের হার সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে; সেখানে ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। বিজ্ঞান শাখায় সাফল্য থাকলেও মানবিক শাখায় চরম বিপর্যয় দেখা গেছে। এ শাখায় সবচেয়ে কম পাশ করেছেন রাজশাহী বোর্ডে—মাত্র ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যশোর বোর্ডে মানবিকে পাশের হার ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ শাখায় সর্বোচ্চ পাশের হার দেখা গেছে ঢাকা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা শাখাতেও এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এখানে ব্যবসায় শিক্ষায় পাশের হার ৬০ দশমিক ০৬ শতাংশ, এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বোর্ড, ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ শাখায় সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রাজশাহী বোর্ড, সেখানে পাশ করেছেন মাত্র ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী। শাখাভিত্তিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির চিত্রেও দেখা গেছে বড় ব্যবধান। ৯ সাধারণ বোর্ডের বিজ্ঞান শাখা থেকেই এসেছে সিংহভাগ জিপিএ-৫। এ শাখা থেকে মোট ২৬ হাজার ৭০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। মানবিক শাখা থেকে ৫ হাজার ৯৭৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষার্থী।