শিক্ষকদের দলাদলি ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেছেন, শিক্ষকতা শুধু জীবিকার পেশা নয়, এটি সম্মান ও দায়িত্বের জায়গা। এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে শিক্ষকতার পরিচয় ব্যবহার করে বিভাজন বা দলাদলিতে জড়ানো উচিত নয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ঢাকা জেলা পর্যায়ে ‘আন্তঃকলেজ সাংস্কৃতিক ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারের ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তেজগাঁও কলেজের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকা জেলার ২৫টি কলেজের ৩৫৭ জন শিক্ষার্থী গান, নৃত্য, কবিতা, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, “দলাদলি বন্ধ করুন, নতুবা শিক্ষকতা ছেড়ে দিন। গত ১৭ বছরের ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন সামনে তাকানোর সময়। সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করুন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করুন। আমরা আর ব্যাকডেটেড থাকতে চাই না।”
শিক্ষকতা পেশার মর্যাদার কথা তুলে ধরে ড. আমানুল্লাহ বলেন, অর্থবিত্তের চেয়ে সম্মান ও মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েই অনেকে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বেশি আয়ের সুযোগ ও মর্যাদাপূর্ণ পদ থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয় থেকে অনেকে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। তাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক শিক্ষকের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা পেশার সম্মানটা যদি আমরা নিজেরাই ধরে রাখতে না পারি, তাহলে শিক্ষকতার নামে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা এই পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে বিকল্প পেশা বা আয়ের পথ বেছে নেওয়াই ভালো।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন ভাইস-চ্যান্সেলর। তিনি বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস প্রোগ্রাম’, ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’, ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (স্কিল এডুকেশন) এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে শিক্ষকদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষকরা সহযোগিতা না করলে সরকার একা কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একা এসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যে নতুন যাত্রা শুরু করেছে, তাতে সবাইকে অংশ নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা নয়; শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় শিক্ষকদের সুযোগ বাড়ানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ করা হয়েছে। আগে পিএইচডির জন্য ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ফুল-টাইম ও পার্ট-টাইম এমফিল এবং গবেষণা সম্পন্ন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক ড. আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে আমরা সুযোগ বাড়াচ্ছি। আপনারা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে আসুন। নিজেদের দক্ষতা বাড়ান এবং সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল শিক্ষার্থী সমাজকে এগিয়ে নিতে দক্ষ ও নিবেদিত শিক্ষকই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিতর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহনশীলতা বাড়াতেও সহায়তা করে।
অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ দর্শনের লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে শিখবে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে।
এই প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে বিজয়ী শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় পর্যায়ে এবং বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করবেন।
তেজগাঁও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক শামীমা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজের মিডিয়া এন্ড থিয়েটার স্ট্যাডিজের সহকারী অধ্যাপক নওরীন সাজ্জাদ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন, শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল করিম, স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. ফকির রফিকুল আলম, স্নাতকপূর্ব শিক্ষা বিষয়ক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. আশেক কবির চৌধুরীসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন কলেজের প্রতিনিধিরা।