প্রত্নতত্ত্বে আধুনিক ধারা ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রত্নস্থল ও প্রত্ননিদর্শন অনুসন্ধানের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (HEAT) সাব-প্রকল্পের উদ্যোগে ‘আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ পদ্ধতি’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের হলরুমে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাননীয় ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন এবং আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান।
অনুষ্ঠানে রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহসান, তুরস্কের Mardin Artuklu University-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু বি. সিদ্দিক এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুল হাছান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও HEAT Sub-Project-এর SPM অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, “কুমিল্লা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। এ মাটির নিচে এখনো বহু অজানা ইতিহাস ও রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব প্রত্নসম্পদ অনুসন্ধান ও নথিবদ্ধ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, গবেষণার মাধ্যমে নতুন তথ্য ও উপাত্ত যেমন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে, তেমনি এর ফলাফল রাষ্ট্র ও সমাজের নীতি নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
মাননীয় ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, “ কুমিল্লার শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার-সহ বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। এসব নিদর্শন একবার ধ্বংস হয়ে গেলে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশনার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আরও সমৃদ্ধ হবে।”
আইকিউএসি’র পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড.সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “আমাদের জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষার্থী প্রয়োজন। একাডেমিক পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দেওয়া সম্ভব হলেও দক্ষ করে তুলতে প্রয়োজন আধুনিক যন্ত্রপাতি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ল্যাব ও ইনস্ট্রুমেন্টের জন্য প্রতি বছর বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আরও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা দরকার। আমি আশা করি, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একদিন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, “এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কুমিল্লা অঞ্চলের ৬টি জেলার ৫৩টি উপজেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক ও সমন্বিত ডকুমেন্টেশন তৈরি করা। প্রায় দুই বছরব্যাপী পরিচালিত এ জরিপে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সরাসরি যুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থাও থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক ডাটাবেজ গড়ে উঠবে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রকল্প শেষে ১৫ থেকে ২০টি গবেষণাপত্র, দুটি প্রকাশনা এবং একঝাঁক দক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক তৈরি হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ময়নামতিকে কেন্দ্র করে নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা।”
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য সংগ্রহ, নথিবদ্ধকরণ ও গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে আলোচনা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।