রাজশাহী নগরীর রেইলগেট ও লক্ষীপুর মোড়ে শব্দদূষণ ১০০ ডেসিবেলের ওপরে

নিউজ ডেস্ক | 71shadhinota.com
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২৬
রাজশাহী নগরীর রেইলগেট ও লক্ষীপুর মোড়ে শব্দদূষণ ১০০ ডেসিবেলের ওপরে

মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা
বৃদ্ধির সঙ্গে রাজশাহী নগরীতে শব্দদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে
পৌঁছেছে। নগরীর ব্যস্ততম এলাকা রেইলগেট ও হাসপাতালকেন্দ্রিক
গুরুত্বপূর্ণ লক্ষীপুর মোড়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক শব্দমাত্রা পরীক্ষায়
উভয় স্থানেই ১০০ ডেসিবেলের বেশি গড় সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা পাওয়া
গেছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ
দেখা দিয়েছে।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এবং
বারিন্দ এনভায়রনমেন্টের সহযোগিতায় শনিবার (১৫ আগস্ট)
রেইলগেট ও লক্ষীপুর মোড়ে শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হয়। পরীক্ষায় নেতৃত্ব
দেন প্রকৌশলী মোঃ জাকির হোসেন খান (পিএইচডি)। তাঁকে
সহযোগিতা করেন ড. অলি আহমেদ, শামসুর রাহমান শরীফ, মোঃ
ওবায়দুল্লাহ, রুমানা আহমেদ, ইফাত আরা, কলি আহমেদ, আবু
তারেক বিন আজিজ, রুহুল হাসান পলাশসহ সংশ্লিষ্ট
স্বেচ্ছাসেবীরা।
সংস্থাটি জানায়, ২০২২ সাল থেকে একই স্থান ও প্রায় একই
সময়সূচিতে রাজশাহী নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে
ধারাবাহিকভাবে শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায়
শনিবার দিনের ব্যস্ততম সময়ে দুই এলাকায় শব্দমাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
পরিমাপে দেখা যায়, সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত
রেইলগেটে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল ১০১ দশমিক ৫ ডেসিবেল।
এরপর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লক্ষীপুর মোড়ে
সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা পাওয়া যায় ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল।
অথচ গত বছর একই দুই স্থানে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল প্রায়
৯৭ ডেসিবেল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে উভয় এলাকাতেই শব্দদূষণের
মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের শব্দদূষণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী শব্দমাত্রার ভিত্তিতে
এলাকাকে নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প-এই পাঁচ
শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী দিনের বেলায়
বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৭০ ডেসিবেল এবং
নীরব এলাকায় ৫০ ডেসিবেল।
রেইলগেট বাণিজ্যিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে
হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকা হওয়ায় লক্ষীপুর মোড় নীরব এলাকার
বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে। ফলে দুই এলাকায় পাওয়া ১০১ দশমিক ৫ ও ১০২
দশমিক ৬ ডেসিবেলের শব্দমাত্রা নির্ধারিত সীমার তুলনায় অত্যন্ত
বেশি।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পরীক্ষার সময় রেইলগেট ও
লক্ষীপুর মোড়ে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটো ও অটোরিকশা
চলাচল করছিল। এসব যানবাহনের অনেকটিতে উচ্চশব্দের টিটি
হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজন না থাকলেও চালকদের অনেককে
বারবার হর্ন বাজাতে দেখা যায়।
রেইলগেট এলাকায় বিভিন্ন বাসকেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ন
বাজাতে দেখা গেছে। পাশাপাশি যত্রতত্র বাস থামানো,
অটোরিকশা ও রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং সুষ্ঠু লেন
ব্যবস্থাপনার অভাবও চালকদের অহেতুক হর্ন ব্যবহারে উৎসাহিত
করছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অনুমোদিত ও
নিয়ন্ত্রিত ধরনের হর্ন ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। একই সঙ্গে
উচ্চশব্দের টিটি হর্নের ব্যবহার বন্ধ, অটোরিকশা ও রিকশার জন্য
নির্দিষ্ট লেন চালু এবং নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামানো বন্ধ
করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, নগরীর বিভিন্ন সড়কে যৌক্তিক
গতিসীমা নির্ধারণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এতে আকস্মিক ব্রেক, তীব্র ত্বরণ এবং অহেতুক হর্নের ব্যবহার
কমবে, যা পরোক্ষভাবে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির ক্ষতি করার পাশাপাশি বিরক্তি,
ঘুমের ব্যাঘাত, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্ধসঢ়;‌স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে
পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার
ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শব্দ পশু-পাখি ও নগর
জীববৈচিত্র‍্যরে ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নগরীর সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব
দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, গাছপালা শব্দের বিস্তার কমাতে
প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই
রাজশাহীকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আম, জাম, নিম,
সজনে ও অন্যান্য দেশীয় ও উপকারী বৃক্ষের ব্যাপক রোপণ প্রয়োজন।
সংস্থাটি জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী নগরীতে শব্দদূষণের মাত্রা
পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তারা কাজ করছে।
বিভিন্ন সময়ে শব্দদূষণবিরোধী লিফলেট বিতরণ,
জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও মানববন্ধনেরও আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, চালক ও নগরবাসীকে
সম্মিলিতভাবে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান
জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও
জনবহুল এলাকায় অপ্রয়োজনে হর্ন নয় নীতি কঠোরভাবে
বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক
শামসুর রাহমান শরীফ বলেন, একটি পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য
রাজশাহী গড়ে তুলতে শুধু রাস্তা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন যথেষ্ট নয়।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সুশৃঙ্খল যান চলাচল ও পর্যাপ্ত সবুজায়নও সমান
গুরুত্বপূর্ণ।