কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মানোন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেল (IQAC) আয়োজিত “Developing Academic Strategic Plan for Comilla University” শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) মাননীয় সদস্য অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব। অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল এবং মাননীয় ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান। কর্মশালায় বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, প্রোগ্রাম সেলফ অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সদস্য ও শিক্ষকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণটি পবিত্র কুরআন পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির মাননীয় সদস্য অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব বলেন, উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, আউটকাম বেইজড এডুকেশন (OBE), অ্যাক্রেডিটেশন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটালাইজেশন এবং শিল্প-একাডেমিয়ার সমন্বয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং বিশ্বমানের দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত; তাই প্রতিষ্ঠানপ্রেম, দায়িত্বশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎকর্ষের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে।
মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, গবেষণা, উদ্ভাবন, আউটকাম বেইজড এডুকেশন (OBE), অ্যাক্রেডিটেশন এবং শিল্প-একাডেমিয়ার কার্যকর সংযোগের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের সকল প্রোগ্রামের সিলেবাসকে আউটকাম বেইজড কারিকুলামে রূপান্তর করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যুগোপযোগী কারিকুলাম, সমস্যা-সমাধানভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণায় বহুমুখী অর্থায়ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়কে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে লালমাটি, কালচারাল হেরিটেজ, গ্রিন ভেজিটেশন, ইপিজেড রয়েছে।এসব সম্ভাবনাগুলিকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক ও কর্মমুখী পাঠক্রম প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশন, ভিশন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাননীয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, একাডেমিক উৎকর্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক মানোন্নয়ন এবং সেলফ-অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি, দুর্বলতা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন ও মিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, গবেষণাবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথি মাননীয় ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের উন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিকীকরণ, ডিজিটালাইজেশন, শিল্প-একাডেমিয়ার সংযোগ এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আধুনিক কারিকুলাম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অ্যালামনাই ও করপোরেট অংশীদারিত্ব এবং স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ওয়ার্কশপের কি-নোট স্পিকার ও অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একাডেমিক একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান-এর কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক উপস্থাপন করে বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ১২ বছর মেয়াদি একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি বিভাগকে নিজস্ব মিশন ও ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন, SWOT বিশ্লেষণ, KPI নির্ধারণ এবং ধারাবাহিক মানোন্নয়ন (CQI) প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া আউটকাম বেইজড এডুকেশন বাস্তবায়নে শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শিল্প-একাডেমিয়ার সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কর্মশালায় রিসোর্স পারসন হিসেবে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান-এর উপর আরো একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোঃ জাকির ছায়াদউল্লাহ খান।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা, মতবিনিময় এবং সুপারিশ প্রদান করেন। অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।